অসমের বিশাল বনাঞ্চল এবং সরকারি জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের হঠাতে রাজ্য সরকারের অনমনীয় মনোভাবের কথা আবারও স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ২৭ লক্ষ বিঘা জমি বিভিন্নভাবে জবরদখল হয়ে আছে। এই বিশাল পরিমাণ ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে দখলদারদের সরানোর প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষা ও নিয়ম মেনে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। মূলত পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার সুনিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করছে সরকার।
এই দখলমুক্ত করার বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান যে, প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৭ লক্ষ বিঘা জমি জবরদখল হওয়ার তথ্য থাকলেও, প্রকৃত উচ্ছেদের পরিধি কিছুটা কমতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বন অধিকার আইনের আওতায় যোগ্য আদিবাসী ও জনজাতীয় পরিবারগুলিকে জমির পাট্টা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একবার এই পাট্টা বা জমির মালিকানা প্রদানের কাজ শেষ হলে দেখা যাবে যে প্রায় ২০ লক্ষ বিঘা জমি প্রকৃতপক্ষেই অবৈধ দখলদারের অধীনে রয়েছে। সরকার মূলত এই এলাকাগুলোকেই লক্ষ্য করে তাদের বুলডোজার অভিযান ও উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, এই অভিযান কেবল জমি উদ্ধার নয়, বরং অসমের অস্তিত্ব রক্ষা এবং জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন রুখবার একটি লড়াই।
সম্প্রতি করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি জেলায় বড়সড় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯১২ বিঘা বনভূমি উদ্ধার করেছে প্রশাসন। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিবসাগরের চরাইদেও-তে অবস্থিত আহোম যুগের ঐতিহাসিক রাজধানী ‘রজাবাড়ি’ এলাকা থেকেও অবৈধ নির্মাণ এবং মাদ্রাসা সরিয়ে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। সরকারের এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রয়াস হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। তবে উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, তার জন্য প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করবে জেলা প্রশাসনগুলো, যাতে দখলদাররা রাজনৈতিক বা জনতাত্ত্বিক সুবিধা নিতে না পারে।
অন্যদিকে, এই উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলগুলি এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলি ভিন্ন মত পোষণ করছে। কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ পাল্টা অভিযোগ করে দাবি করেছেন যে, সরকার যখন সাধারণ গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করছে, তখন মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের বিরুদ্ধেই ১২ হাজার বিঘা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। বিরোধীদের মতে, এই উচ্ছেদ অভিযান মূলত একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে, আদালতের নির্দেশ মেনেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করা হচ্ছে এবং কোনও বৈধ ভারতীয় নাগরিককে হয়রানি করা হবে না। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ের পর এই অভিযান এখন এক নতুন আইনি বৈধতা পেয়েছে, যার ফলে আগামী দিনগুলোতে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
