আসামের বিশ্ববিখ্যাত চা শিল্প বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখে। একদিকে শ্রমিক কল্যাণে সরকারের ভূমি নীতি, অন্যদিকে ঋণের দায়ে জর্জরিত বাগান মালিকদের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জোহরাটে অনুষ্ঠিত চা অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া বা টিএআই-এর (TAI) দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে রাজ্য সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দিলেন সংগঠনের সভাপতি শৈলজা মেহতা।আসামের চা বাগান শ্রমিকদের জমির অধিকার বা ‘পট্টা’ দেওয়ার সরকারি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এখন উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। তবে টিএআই-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপ মহৎ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি ঝুঁকি। সংগঠনের দাবি, চা বাগানের অধিকাংশ জমি বর্তমানে ব্যাংক ঋণের জন্য জামিন বা ‘মর্টগেজ’ হিসেবে রাখা আছে। এই জমির মালিকানা হস্তান্তর করা হলে বাগান মালিকরা ভয়াবহ আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
সভাপতি শৈলজা মেহতা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকার জমি বণ্টন করতেই পারে, কিন্তু চা বাগানের ভেতরে শ্রমিকদের কোয়ার্টার এবং অন্যান্য পরিকাঠামো কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ। ২০১৩ সালের ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আইনের’ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ছাড়া এই পরিকাঠামো কেড়ে নেওয়া হবে অসাংবিধানিক।
আর্থিক সংকটের আরও একটি বড় কারণ হলো ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ। বর্তমানে চা উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যয় হয় শ্রমিকের মজুরিতে। টিএআই-এর মতে, নতুন ‘কোড অন ওয়েজেস’-এর ফলে বাগান কর্তৃপক্ষকে দ্বিমুখী আর্থিক বোঝা বইতে হচ্ছে। আইন অনুযায়ী আবাসন ও রেশনের মতো সুযোগ-সুবিধা দিলেও মজুরির মাত্র ১৫ শতাংশ তা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলে বাগান মালিকদের একদিকে নগদ মজুরি বাড়াতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে ২০২০ সালের নিরাপত্তা আইন মেনে ব্যয়বহুল আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার রক্ষণাবেক্ষণও করতে হচ্ছে।আসামের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বিদেশের সস্তা চায়ের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে টিএআই রাজ্য সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের দাবি, শ্রমিক আবাসনের দায়ভার সরাসরি সরকারি প্রকল্পের অধীনে নেওয়া হোক এবং জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মালিক পক্ষকে আইনি দায়মুক্ত করা হোক। এখন দেখার, সরকার এই ‘সতর্কবার্তা’ শোনার পর চা শিল্পের স্বার্থে কী পদক্ষেপ নেয়।
