February 12, 2026
Screenshot 2026-02-12 145727

আসামের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এক চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে আদালত কর্তৃক কংগ্রেস নেতাদের ওপর জারিকৃত একটি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দায়ের করা মানহানির মামলার প্রেক্ষিতে আদালত এই নির্দেশ প্রদান করেছে। দীর্ঘ শুনানি ও উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনার পর বিচার বিভাগ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, কংগ্রেসের নির্দিষ্ট কিছু নেতৃত্ব বা দলের কোনো সদস্য মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ভিত্তিহীন, যাচাইহীন কিংবা সরাসরি মানহানিকর কোনো মন্তব্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারবেন না। এই নির্দেশটি কেবল সাধারণ বক্তৃতার ক্ষেত্রে নয়, বরং ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে, রাজনৈতিক ময়দানে সমালোচনা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলেও, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন বা প্রমাণের অভাবে কারো সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ করা আইনের পরিপন্থী।

বিগত বেশ কিছু মাস ধরে আসামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। বিভিন্ন জনসভা এবং জনাকীর্ণ সমাবেশে কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ করে আসছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে করা এইসব মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর পক্ষের আইনজীবীদের দাবি ছিল যে, বিরোধী পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে জনসাধারণের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। আদালতের এই সাম্প্রতিক নির্দেশে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি করার উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যকে বাকস্বাধীনতার আড়ালে ঢাকা দেওয়া যায় না। বিচারক তাঁর রায়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, সংবিধানে প্রদত্ত বাকস্বাধীনতা কোনো অসীম ক্ষমতা নয়; এর সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সত্যনিষ্ঠার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে একজন সাংবিধানিক পদের অধিকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যখন কোনো অভিযোগ আনা হয়, তখন তার পিছনে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থাকা আবশ্যক।

এই রায়ের ফলে আসামের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে সামনের নির্বাচনী মরসুমের আগে এই নিষেধাজ্ঞা বিরোধী দল কংগ্রেসের জন্য একটি বড় ধরণের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারের মূল অস্ত্র হিসেবে যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা দুর্নীতির অভিযোগ ব্যবহার করা হয়, তখন আদালতের এমন কড়াকড়ি বিরোধী শিবিরের প্রচারের গতি কমিয়ে দিতে পারে। কংগ্রেস নেতাদের এখন থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক মঞ্চে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শব্দ চয়ন করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই আদালতের অবমাননা না হয়। অন্যদিকে, এই নির্দেশকে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার একটি বড় নৈতিক জয় হিসেবে দেখছে শাসক শিবির। তাঁদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে বিরোধীদের প্রচার ছিল মূলত প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার।

তবে এই নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস শিবিরের অবস্থান এখনো কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। দলের অভ্যন্তরে গুঞ্জন রয়েছে যে, তারা এই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারে। গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বিরোধী দলের প্রতিবাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেক কংগ্রেস সমর্থক। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো অভিযোগের সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আদালত সাধারণত এই ধরণের নির্দেশ বহাল রাখে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসামের রাজ্য রাজনীতি এখন এই আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে আছে। এটি কেবল একটি মানহানির মামলা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং আইনি সীমাবদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই নির্দেশ আসামের রাজনীতিতে পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির সংস্কৃতিতে কতটা পরিবর্তন আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *