প্রয়াত আসামি গায়ক–সুরকার জুবিন গার্গকে ঘিরে আসামের প্রকাশনা জগতে এক অভূতপূর্ব স্রোত দেখা দিয়েছে। তাঁর জীবন, সঙ্গীত ও উত্তরাধিকারের উপর ভিত্তি করে একের পর এক বই প্রকাশিত হচ্ছে—গান, কবিতা, তথ্যচিত্র ও জীবনীমূলক রচনা—যা তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রকাশনা জগৎকে নতুন প্রাণ দিয়েছে।
চলমান গুয়াহাটি বইমেলাতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের মতে, জুবিন গার্গ সম্পর্কিত বইগুলোই বিক্রির শীর্ষে রয়েছে এবং পাঠকদের কাছে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন।
এই আবহে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন সংকলন—‘জুবিনৰ গদ্য’, যা জুবিন গার্গের নিজের লেখা গদ্য রচনার সংগ্রহ। তাঁর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গার্গ ও বোন পামি বার্থাকুর বইমেলায় এই সংকলনের উদ্বোধন করেন। এতে শিল্পীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত উভয় ধরনের গদ্য রচনা একত্রিত করা হয়েছে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আসাম পাবলিকেশন বোর্ডের সম্পাদক প্রমোদ কালিতা, সংকলক জনার্দন গোস্বামী, এবং জুবিন গার্গের দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রাঞ্জিত সাইকিয়া।
গরিমা সাইকিয়া গার্গ অনুষ্ঠানে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জুবিন গার্গকে নিয়ে বহু বই প্রকাশিত হয়েছে পরিবারের অনুমতি ছাড়াই এবং যথাযথ তথ্য যাচাই ছাড়াই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জুবিনৰ গদ্য’ আসাম পাবলিশিং কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর কপিরাইট আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নামে নিবন্ধিত, যা জুবিন গার্গের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের প্রতি সম্মান ও সত্যতা নিশ্চিত করে।
এই বইয়ে আসামের বাইরের সৃজনশীল সহযোগিতাও যুক্ত হয়েছে। প্রকাশক সঞ্জয় সান্যাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত, আর কলকাতার শিল্পী রোদ্দুর বইটিতে জুবিন গার্গের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়কে তুলে ধরে পেন্সিল স্কেচ এঁকেছেন।
সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন বিশিষ্ট গবেষক মঞ্জিত রাজকোণ্বর, যিনি আসামি সঙ্গীতের সংরক্ষণ ও ঐতিহাসিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। প্রথমবারের মতো জুবিন গার্গের বিভিন্ন সময়ে লেখা গদ্য একত্রে প্রকাশিত হলো।
বইটির ভূমিকায় গরিমা সাইকিয়া গার্গ লিখেছেন, জুবিন গার্গের নিজের ভাষা ও শব্দের মাধ্যমে পাঠকরা তাঁর জীবন, সঙ্গীত ও চিন্তাধারাকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুভব করতে পারবেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সংকলন পাঠকদের কাছে জুবিন গার্গের এক নতুন পরিচয় তুলে ধরে—একজন গদ্য লেখক হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।
সংকলনে রয়েছে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতি, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিফলন, নিজের গান নিয়ে ভাবনা এবং প্রিয় শিল্পীদের প্রতি অনুভূতি। সম্পাদক জানিয়েছেন, এই লেখাগুলোর শক্তি অলঙ্কৃত ভাষায় নয়, বরং আবেগ ও আন্তরিকতায়।
সহজ, সরল ও হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে লেখা এই গদ্য পাঠকদের সামনে তুলে ধরে জুবিন গার্গের আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা—যা তাঁর সঙ্গীতের বাইরেও বিস্তৃত। বইটিতে সমাজ, সময় ও মানবসম্পর্ক নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণও রয়েছে, যা পাঠকদের কাছে তাঁকে এক স্বতন্ত্র গদ্য লেখক হিসেবে পরিচিত করে।
‘জুবিনৰ গদ্য’ হৃদয় থেকে হৃদয়ে সংযোগ স্থাপনের এক আন্তরিক প্রয়াস—যেখানে তাঁর গান, শব্দ ও চিন্তা একত্রিত হয়েছে। একইসঙ্গে এটি আসামি ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রয়োজনীয়তারও স্মারক।
প্রয়াত শিল্পীর সঙ্গে গভীর সংযোগ খুঁজতে থাকা পাঠকদের কাছে ‘জুবিনৰ গদ্য’ হয়ে উঠেছে এক অন্তরঙ্গ ও প্রামাণ্য সংযোজন, যা তাঁর সঙ্গীতের বাইরের অন্তর্জগতের এক বিরল ঝলক তুলে ধরে।
