ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নিজ প্রচেষ্টা, স্বপ্ন আর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন—দারিদ্র্য কোনো বাধা নয়, বরং সাফল্যের পথে প্রথম ধাপ। তেমনই এক নাম কোনোসুকে মাতসুশিতা, বিশ্বের অন্যতম ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট Panasonic-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে আজও জাপানিরা ডাকেন “দেবতা-সম উদ্যোক্তা” নামে।
১৮৯৪ সালের ২৭ নভেম্বর জাপানের ওয়াকায়ামা অঞ্চলে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কোনোসুকে মাতসুশিতা। শৈশবেই তাঁর জীবনে নেমে আসে দুর্ভাগ্যের ছায়া। বাবার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলে মাত্র নয় বছর বয়সেই তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। শিক্ষার পথ থেমে গেলেও শেখার আগ্রহ থামেনি। সংসারের চাপে তিনি সাইকেলের দোকানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কোনোসুকে ছোটবেলা থেকেই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাঁকে নিয়ে যায় ওসাকায়। সেখানে তিনি একটি বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি নেন। বিদ্যুতের প্রতি প্রবল আগ্রহ ও শেখার ইচ্ছা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। অবসর সময়ে তিনি নতুন নতুন যন্ত্রপাতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। তাঁর মনে দৃঢ় হয়ে উঠেছিল একটি বিশ্বাস—“একদিন আমি এমন কিছু বানাব, যা মানুষের জীবনকে সহজ করবে।”
১৯১৮ সালে স্ত্রী ও শ্যালকের সহায়তায় মাত্র কয়েকজন কর্মী নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠান—Matsushita Electric Housewares Manufacturing Works। এখানেই জন্ম নেয় Panasonic-এর বীজ। তাঁদের প্রথম পণ্য ছিল ল্যাম্প সকেট। শুরুতে বিক্রি তেমন ভালো হয়নি। কিন্তু কোনোসুকে কখনও হাল ছাড়েননি। মানের সঙ্গে কোনো আপস না করায় ও নতুন আইডিয়ার প্রয়োগে ক্রেতারা ধীরে ধীরে তাঁর পণ্যের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।
এই ছোট্ট কোম্পানিই পরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান Panasonic Corporation-এ পরিণত হয়।
কোনোসুকে মাতসুশিতার কোম্পানি ধীরে ধীরে টেলিভিশন, রেডিও, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ব্যাটারি, ক্যামেরা—প্রায় প্রতিটি গৃহস্থালি ও আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যে বিশ্বনেতা হয়ে ওঠে। তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সাহসী সিদ্ধান্ত Panasonic-কে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
কোনোসুকে শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক দার্শনিকও। তাঁর মূল দর্শন ছিল— “ব্যবসা শুধুমাত্র মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের উন্নতির জন্য।”
তিনি কর্মীদের কখনো কেবল শ্রমিক বা সহকর্মী মনে করতেন না, বরং পরিবার ভেবে তাঁদের মর্যাদা দিতেন। তাই Panasonic- এর কর্মীরা সর্বদা কোম্পানির প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন।
১৯৮৯ সালের ২৭ এপ্রিল কোনোসুকে মাতসুশিতা মৃত্যুবরণ করেন। পেছনে রেখে যান এক বিশাল সাম্রাজ্য, যা শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং একটি বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Panasonic আজ কোটি কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে।
আজও তাঁর জীবনী তরুণ উদ্যোক্তাদের শেখায়— দারিদ্র্য কোনো অভিশাপ নয়। অধ্যবসায়, সততা আর স্বপ্ন থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।সাফল্য তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
কোনোসুকে মাতসুশিতা কেবল একজন উদ্যোক্তা নন, তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে একজন সাধারণ কৃষকের ছেলে থেকেও বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় লেখা যায়। আর সেই অধ্যায় আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে, শিখিয়ে যাচ্ছে “হাল ছাড়ো না, একদিন সফলতা আসবেই।”
