ইরানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সম্প্রতি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনিকে ইরানের তৃতীয় ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে নির্বাচিত করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর উদ্ভূত শূন্যতা পূরণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নেতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তার পুত্রকে মনোনীত করা হলো, যা ইরানের শাসনতান্ত্রিক আদর্শের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং ‘জুয়া’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘকাল ধরে তার পিতার কার্যালয়ের অন্তরালে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন। যদিও তিনি কখনোই কোনো নির্বাচিত বা আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে ছিলেন না, তবে ইরানের প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর তার ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে আইআরজিসি-র সরাসরি চাপে বিশেষজ্ঞ পরিষদ তড়িঘড়ি করে এই নিয়োগ সম্পন্ন করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং আইআরজিসি-র প্রভাব বজায় রাখতেই মোজতবাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
মোজতবার এই পদোন্নতি নিয়ে ইরানের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল রাজতন্ত্র ও বংশানুক্রমিক শাসনের অবসান ঘটানো। খামেনিপুত্রকে সর্বোচ্চ নেতা করার মাধ্যমে সেই বিপ্লবী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ইরান আবারও এক ধরনের ‘পারিবারিক রাজতন্ত্রের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। এ ছাড়া মোজতবা তার পিতার চেয়েও অনেক বেশি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত, যা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিয়োগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইরানের জন্য এই সিদ্ধান্তটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া কারণ এটি দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে, যারা আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকট ও কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে অসন্তুষ্ট। একই সাথে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে একজন অনভিজ্ঞ কিন্তু কট্টরপন্থী নেতার হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হতে পারে। মোজতবা খামেনি কি তার পিতার মতো কঠোরভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, নাকি এই বংশতান্ত্রিক উত্তরাধিকারই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের কারণ হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
