২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (LDP) এক বিশাল জয় ছিনিয়ে এনেছে। তারা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে একটি ঐতিহাসিক “সুপার-মেজরিটি” বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই বিশাল বিজয় জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং তার উচ্চাভিলাষী রক্ষণশীল পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেট বা জনসমর্থন দিয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল
৪৬৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভায় (House of Representatives) এলডিপি একাই ৩১৬টি আসন জিতেছে, যা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৩৩টি আসনের চেয়ে অনেক বেশি। ১৯৫৫ সালে দলটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটিই তাদের সেরা পারফরম্যান্স। এমনকি ১৯৮৬ সালে ইয়াসুহিরো নাকাসোনের গড়া ৩০০ আসনের রেকর্ডকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে।
তাদের জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি (JIP) ৩৬টি আসন পেয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন জোটের হাতে এখন ৩৫২টি আসন রয়েছে। এই “দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক; এর ফলে সরকার উচ্চকক্ষের (যেখানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ বাজেট এবং আইন পাস করতে পারবে। এটি তাকাইচির নীতিগুলো বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করবে।
বিপর্যস্ত বিরোধী দল
এই নির্বাচন বিরোধী শিবিরের জন্য ছিল একটি চরম আঘাত। নবগঠিত সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স (CRA)—যা কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং কোমেতোর একীভূত রূপ—তাদের আসন সংখ্যা ১৬৭ থেকে কমে মাত্র ৪৯-এ নেমে যেতে দেখেছে। ভোটাররা এই শেষ মুহূর্তের জোটকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে মনে হচ্ছে, কারণ অনেকে এটিকে ঐক্যবদ্ধ রূপকল্পের চেয়ে ক্ষমতার লড়াই হিসেবেই দেখেছিলেন। পরাজয়ের পর বিরোধী নেতা ইয়োশিহিকো নোদা এবং তেতসুও সাইতো দুজনেই পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কেন জিতলেন তাকাইচি?
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির এই জয়ের পেছনে বড় কারণ ছিল তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে। তার “কাজ, কাজ এবং কাজ” মন্ত্র এবং কঠোর অথচ আধুনিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তির কারণে তিনি এলডিপি-কে সাম্প্রতিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি থেকে দূরে সরিয়ে সফলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
তার প্রচারণার মূল ভিত্তি ছিল দুটি: ১. অর্থনৈতিক স্বস্তি: তিনি মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়াই করা নাগরিকদের সহায়তার জন্য ২১ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিশাল উদ্দীপনা প্যাকেজ এবং খাবারের ওপর ৮% ভোগ কর (Consumption Tax) দুই বছরের জন্য স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২. জাতীয় নিরাপত্তা: নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কঠোর মনোভাবাপন্ন হিসেবে পরিচিত তাকাইচি জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির এই সময়ে ভোটারদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
এই বিজয়ের পর আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি তাকাইচি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিশ্চিত হতে যাচ্ছেন। তার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের বাজেট পাস করা এবং সংবিধান সংশোধন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া—যা এলডিপির একটি দীর্ঘদিনের লক্ষ্য এবং এখন সুপার-মেজরিটির কারণে যা অর্জন করা সম্ভব।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বনেতারা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং আগামী মার্চে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যা তার মেয়াদে মার্কিন-জাপান জোট আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। জাপানের এই নতুন অধ্যায়ে তাকাইচির “জাপান ফার্স্ট” নীতি দেশটির অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
