April 10, 2026
image (19)

প্রতি নির্বাচনের মতো ২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনেও ‘বন্যামুক্ত আসাম’ গড়ার স্লোগানটি রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসামে বন্যার ভয়াবহতা কমার বদলে বরং প্রতি বছর তা আরও জটিল আকার ধারণ করছে। ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টারের (এনআরএসসি) উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজ্যে বন্যার বিস্তৃতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২০ সালে রাজ্যে সর্বোচ্চ ১২.৮৬ লক্ষ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছিল, যার ঠিক পরেই রয়েছে ২০২২ সাল, যেখানে বন্যার কবলে পড়েছিল ১২.১৫ লক্ষ হেক্টর এলাকা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত পাঁচ বছরে রাজ্যে বর্ষার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও বন্যার প্রকোপ কমেনি। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে যেখানে ২.১১ লক্ষ হেক্টর এলাকা প্লাবিত হয়েছিল, সেখানে ২০২০ সালে তা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছায়। গবেষকদের মতে, এটি কেবল বৃষ্টির পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর পেছনে রয়েছে নদী অববাহিকার কাঠামোগত পরিবর্তন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২, ২০১৭, ২০২০ এবং ২০২২ সালে বন্যার বিস্তৃতি ১০ থেকে ১২.৮৫ লক্ষ হেক্টরের মধ্যে ছিল। এছাড়া ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার সংখ্যা ৩০-এর গণ্ডি অতিক্রম করেছে। সরকারি মেমোরেন্ডাম অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর ২০১৯ সালে সর্বাধিক ৭০ লক্ষ মানুষ বন্যার কবলে পড়েন এবং ২০২২ সালে প্রাণ হারান ১৭৯ জন।

বন্যার এই ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতার পেছনে বৃষ্টির চেয়েও বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে পলি জমা বা সেডিমেন্টেশন। ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বিপুল পরিমাণ পলি জমার ফলে নদীর নাব্যতা কমছে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় বন্যার পানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ধেমাজি ও লখিমপুরের মতো জেলাগুলোতে ভারি পলি জমার ফলে বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি স্থায়ীভাবে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আকাঙ্খা বড়গোহাইনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বালু ও পলি জমার কারণে কৃষকরা পৈত্রিক পেশা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি আসামের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, আসামের প্রাকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টিও বন্যানিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি সাহারিয়ার মতে, রাজ্যে ১০০ হেক্টরের বেশি বড় জলাভূমি রয়েছে ৮৭টি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি জলাভূমির প্রায় ৮০ শতাংশই ভরাট হয়ে যাওয়ায় তাদের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বৃষ্টির পানি জলাভূমিতে জমা হওয়ার পরিবর্তে নতুন নতুন জনপদ ও এলাকা প্লাবিত করছে। পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জলাভূমি দখল এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায়ী।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, বন্যার সমস্যা সমাধানে খণ্ডিত বা ‘পিস মিল’ পদ্ধতি অবলম্বন করলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে না। এক জায়গায় বাঁধ দিলে বা সমস্যার সমাধান করলে অন্য জায়গায় নতুন সংকট তৈরি হওয়া ব্রহ্মপুত্রের মতো গতিশীল নদীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। তাই প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সামগ্রিক এবং বহুমাত্রিক ‘রিভার বেসিন ম্যানেজমেন্ট’ বা নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। ব্রহ্মপুত্র একটি নবীন ও গতিশীল নদ হওয়ায় এখানে কেবল ‘বন্যানিয়ন্ত্রণ’ নয়, বরং ‘বন্যা অভিযোজন’ বা বন্যার সাথে মানিয়ে নেওয়ার কৌশলের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনের মৌসুমে গালভরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে এমন বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপই আসামের সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *