ভালুক বললেই সাধারণত মানসপটে ভেসে ওঠে কালো রোমশ বড় বড় নখের পেল্লায় আকারের এক প্রাণী। যাতে অরণ্যে নিরাপদে বাস করতে পারে, সেই কারণে তাদের জন্যও তৈরি হয়েছে অভয়ারণ্য। ভারত জুড়ে আছে এমন কয়েকটি জাতীয় উদ্যান, যা ভালুকের আবাস্থল। নির্দিষ্ট স্থানের বাইরেও অবশ্য ভালুক ঘোরাফেরা করে।
কেউ অরণ্যে যান বাঘের ছবি তুলতে, কারও শখ হাতি দেখার। তবে বাঘ, সিংহ, হাতি, গন্ডার শুধু নয়, শখ থাকলে যেতে পারেন ভালুকের খোঁজেও।
ক্রমবর্ধমান জনবসতি, চোরাশিকারিদের আগ্রাসন, বন্যপ্রাণ-মানুষের সংঘাতে প্রাণীটি যাতে লুপ্ত না হয়ে যায়, সে কারণেই তাদের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। তৈরি হয়েছে তাদেরও আবাসস্থল, যেখানে তারা নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করতে পারে। তৈরি হয়েছে ভালুকদের জন্য অভয়ারণ্য।
ভালুক মানেই কিন্তু সর্বদা কালো রঙের বিশাল বপুর প্রাণী নয়, তাদেরও রকমফের রয়েছে। মোটামুটি চার রকমের ভালুকের দেখা মেলে এই দেশে। স্লথ বিয়ার, এশিয়াটিক বা হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, হিমালয়ান ব্রাউন বিয়ার এবং সান বিয়ার। ভারতের সমতল এলাকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্লথ বিয়ার। ঘন, কালো রোমশ চেহারার ভালুকটি দরকার পড়লে বেশ জোরে দৌড়োতে পারে। বড় পাঞ্জা এবং ধারালো নখের এই ধরনের ভালুক উইপোকা খেতে পছন্দ করে। গলায় থাকে ভি আকৃতির সাদা চিহ্ন।
হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ারের দেখা মেলে হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায়। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, কাশ্মীরের পার্বত্য এলাকাই এদের বিচরণক্ষেত্র। কালো চকচকে রোমশ শরীর, গলার কাছে উজ্জ্বল ভি আকৃতির সাদা ছাপ থাকে বলে একে ‘মুন বিয়ার’-ও বলে।
ব্রাউন বিয়ারের সাকিন হিমালয়ের উঁচু পাহাড়ি এলাকায়, লেহ্-লাদাখের মতো অঞ্চলে। এর গায়ের রোম কালো নয়, বরং বাদামি বা খয়েরি। আর এই সবের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আকারের ভালুকটি হল সান বিয়ার। মধু খেতে খুব ভালবাসে এই ভালুক। এর গলা এবং বুকের কাছের ভি আকৃতির ছোপটি কিছুটা কমলাটে ধরনের হয়। উত্তর-পূর্ব ভারত, যেমন অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুরের মতো জায়গায় এই ধরনের ভালুকের দেখা মেলে।
দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নানা প্রজাতির ভালুকের দেখা পাওয়া সহজ কথা নয়। সব জায়গায় যাওয়াও যায় না। স্লথ বিয়ারের নির্ভয়ে বিচরণের জন্য দারোজি স্লথ বিয়ার অভয়ারণ্যটি তৈরি হয়েছে কর্নাটকের বল্লারি জেলায়। হাম্পি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অরণ্যের অবস্থান। মোটামুটি মার্চ থেকে এপ্রিল-মে নাগাদ এই অরণ্যে ভালুক দেখতে পাওয়ার ভাল সুযোগ থাকে। রয়েছে সাফারির ব্যবস্থা। নজরমিনার-সহ অরণ্যের বেশ কয়েকটি জায়গা রয়েছে, যেখান থেকে সাধারণত ভালুকের দেখা মেলে। বিশেষ বিশেষ জায়গায় বনকর্মীরা বোল্ডারের গায়ে গুড় এবং খাবার রেখে যান, যার টানে সপরিবার দেখা দেয় ভালুকেরা। বরাত ভাল থাকলে, বাচ্চা-সহ স্লথ বিয়ারের দেখা মিলতে পারে এমনই কোনও স্থানে। এই অভয়ারণ্যে দুপুর থেকে সাফারি শুরু হয়, চলে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত। তবে শুধু ভালুক নয়, এই অরণ্য আরও অনেক বন্যপ্রাণের বাসভূমি।
গুজরাতের বানসকণ্ঠ জেলায় পালনপুর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে জেসোরের পাহাড়ি এলাকার এই বনাঞ্চল ভালুকদের আস্তানা। আরাবল্লি বাস্তুতন্ত্রের অংশ এটি, এক দিকে রয়েছে ঊষর রুক্ষ ভূমি, অন্য দিকে পর্ণমোচী বন। ভালুক ছাড়াও এই অরণ্যে লেপার্ড, হায়েনা, শিয়াল, বুনো শুয়োর, পাখি-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণের
মধ্য গুজরাতের দাহোদ জেলায় রয়েছে রতনমহল স্লথ বিয়ার অভয়ারণ্য। জায়গাটি মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাতের সীমান্তবর্তী এলাকায়। এই অরণ্যে যথেষ্ট সংখ্যক ভালুক আছে। লেপার্ডও দেখা যায় এই অরণ্যে। এখানকার ‘টিমরু’ এবং ‘সাদাদ বন’ ভালুকদের থাকার জন্য উপযুক্ত জায়গা। এই জঙ্গলে প্রচুর জাম গাছ আছে। ভালুকেরা সেই ফল খায়
হিমাচল প্রদেশের কুল্লু জেলার বানজারে অবস্থিত এই জাতীয় উদ্যানটি হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, স্নো লেপার্ড-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণের আস্তানা। ২০১৪ সালে এই বনভূমি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়। এই বনাঞ্চলে ১২০০-৩,৩০০ মিটারের মধ্যে মোটামুটি একটি করে ভালুকের দেখা মেলে। ওক, রডোডেনড্রনের মতো সরলবর্গীয় বৃক্ষের অরণ্যেই এদের বাসস্থান।
শ্রীনগর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দাচিগাম জাতীয় উদ্যান মূলত হাঙ্গুলের জন্য খ্যাত। হাঙ্গুল মধ্য এশিয়ান রেড ডিয়ারের উপপ্রজাতি। পুরুষদের মাথায় শিং থাকে। তবে শুধু হাঙ…
হিমালয়ান ব্রাউন বিয়ারের বিচরণক্ষেত্র সাধারণত ঘন জঙ্গল নয়, রুক্ষ ঊষর পাহাড়ি উপত্যকায় এদের বাস। কার্গিলের দ্রাস-প্যানদ্রাস এলাকার বিশেষ কিছু জায়গায় দেখা মেলে এই ধরনের ভালুকের। তবে তা দেখতে যাওয়ার জন্য দরকার অভিজ্ঞ গাইড। এপ্রিল-মে মাসই এ জন্য আদর্শ, কারণ, এই এলাকা অত্যন্ত শীতল।
ঘুনচাপালী চণ্ডী মাতার মন্দি ছত্তীসগঢ়ের মহাসুমন্দ জেলার বাগবাহারার চণ্ডীমাতার মন্দিরটি ভালুক দর্শনের জন্য জনপ্রিয়।বন্য ভালুক এবং মানুষের এক অদ্ভুত সহাবস্থানের ছবি এখানে ধরা পড়ে। প্রতি দিন স্লথ বিয়ার পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে এখানে আসে খাবারের টানে। ভক্তদের দেওয়া নারকেল, গুড়, কলা খায় তারা। অদ্ভুত ভাবে তারা কারও ক্ষতি করে না বা হিংস্র হয়ে ওঠে না। নিজের মতো এসে খেয়ে চলে যায়। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, তারা ঈশ্বরভক্ত। কেউ তাদের বিরক্ত করে না। ভিড়ভাট্টা কমে গেলে, এক ফাঁকে এসে ভালুকেরা খাবার খেয়ে যায়।
জাতীয় উদ্যান হোক বা অভয়ারণ্য— বনাঞ্চল বন্যপ্রাণের ক্ষেত্র। সেখানে গেলেই যে ভালুকের দেখা মিলবেই তা নয়, তবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারলে দেখা মিলতে পারে। তবে ভালুক বা বন্যপ্রাণ দেখতে গেলেও সব সময়ে বনের নিয়মটি মাথায় রাখা দরকার।
