গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো ব্যালট। কিন্তু সেই ব্যালটেই যদি পছন্দের কোনো প্রার্থী না থাকে? এই অভাব পূরণ করতেই ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভারতে চালু হয়েছিল ‘নোটা’ (NOTA) বা ‘উপরের কেউ নন’ বিকল্পটি। উদ্দেশ্য ছিল প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করার অধিকার দেওয়া। তবে এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় নির্বাচনে নোটা-র প্রভাব ক্রমশ নিম্নমুখী।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় স্তরে নোটা-র ভোট শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৯৯ শতাংশে। ২০১৪ সালে যা ছিল ১.০৮ শতাংশ। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাজ্যেও নোটা-র হার মাত্র ০.৮১ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে চলমান ২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক গতিপ্রকৃতিও সেই একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র মতো বড় শক্তির অনুকূলে যখন বড় ধরনের জনাদেশ বা ‘ম্যান্ডেট’ তৈরি হয়, তখন সাধারণ ভোটাররা প্রতিবাদী ভোটের বদলে সরাসরি কোনো পক্ষ বেছে নিতেই বেশি আগ্রহী হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিকাশ ত্রিপাঠীর মতে, যখন নির্বাচনে একটি শক্তিশালী ঢেউ থাকে, তখন নোটা তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়। তিনি মনে করেন, যদি নির্বাচনী ফলাফল ঝুলে থাকত বা জোট গঠনের লড়াই হতো, তবে হয়তো নোটা-র গুরুত্ব কিছুটা অনুভূত হতো। কিন্তু আসামের বর্তমান ফলের ট্রেন্ড বলছে, ভোটাররা কৌশলগতভাবে ভোট দিচ্ছেন।
নোটা-র এই পতনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর গঠনগত সীমাবদ্ধতা। ভারতের আইন অনুযায়ী, কোনো কেন্দ্রে যদি নোটা সব প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পায়, তবুও সেখানে পুনরায় নির্বাচন হয় না। বরং নোটা-র পরে থাকা সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকেই জয়ী ঘোষণা করা হয়। এই ‘ফলাফলহীন’ অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
গুয়াহাটির সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে পেশাজীবী—অনেকের মতেই, নোটা এখন কেবলই একটি ‘ভদ্রভাবে অসম্মতি জানানো’র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এখন ‘মন্দের ভালো’ বেছে নেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ, ভোট নষ্ট না করে অন্তত এমন কাউকে বেছে নেওয়া যাঁর দ্বারা কোনো ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে।
পরিশেষে, বর্তমান নির্বাচনী আবহে নোটা তার গুরুত্ব হারিয়ে কেবল একটি প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে। নির্বাচনী সংস্কারের মাধ্যমে যদি নোটা-কে আরও শক্তিশালী করা না হয়, তবে আগামী দিনে এটি কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় একটি নগণ্য অংশ হিসেবেই থেকে যাবে।
