উত্তর-পূর্ব ভারতের উদ্ভাবন, উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ত্রিপুরাকে গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর (DIT), ত্রিপুরা সরকার এবং ভারতের অন্যতম শীর্ষ উদ্ভাবন সহায়ক সংস্থা ও স্টার্টআপ লালন-পালনের পথিকৃৎ টি-হাব (T-Hub), হায়দরাবাদ-এর যৌথ উদ্যোগে আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে ‘বিল্ডিং আ ইউনিকর্ন ইন ত্রিপুরা’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
‘বিল্ডিং আ ইউনিকর্ন ইন ত্রিপুরা’ থিমকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল রাজ্যের উদীয়মান উদ্যোক্তাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণযোগ্য উদ্যোগ গড়ে তুলতে উৎসাহিত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। ‘ইউনিকর্ন’ বলতে এমন একটি বেসরকারি স্টার্টআপকে বোঝায়, যার মূল্যায়ন ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। ত্রিপুরা থেকে আগামী দিনে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে টি-রাইজ (T-RISE—Tripura Registry & Integration for Startup Ecosystem) পোর্টাল চালু করা হয়। পাশাপাশি রাজ্যের স্টার্টআপ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে একাধিক শীর্ষস্থানীয় শিল্প সংস্থার সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতাপত্র (MoU) বিনিময় করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বারবার স্টার্টআপকে উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ‘বিকশিত ভারত’ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্য সরকারও প্রগতিশীল নীতি, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহার নেতৃত্বে এবং তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ, পরিকল্পনা ও সমন্বয় দপ্তরের মন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়ের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় ত্রিপুরা সরকার নতুন সেক্টর-অ্যাগনস্টিক ত্রিপুরা স্টার্টআপ পলিসি চালু করেছে। সমস্ত ক্ষেত্রে উদ্ভাবন, উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর হাপানিয়ার ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টারে রাজ্যস্তরের ইনকিউবেশন সেন্টার টি-নেস্ট (T-NEST) স্থাপন করেছে। এখানে স্টার্টআপগুলিকে বিশ্বমানের ইনকিউবেশন, মেন্টরশিপ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ দেওয়া হবে। স্টার্টআপ নীতি বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী করতে জ্ঞান-সহযোগী হিসেবে টি-হাবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বও করেছে তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর। এর মাধ্যমে টি-হাবের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং অ্যাক্সিলারেটর প্রোগ্রামের সুবিধা রাজ্যের স্টার্টআপরা পাবে।
কর্মশালার উদ্বোধন করেন তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ, পরিকল্পনা ও সমন্বয় দপ্তরের মন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর সচিব, গুড গভর্ন্যান্স দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্তে, আইএএস, তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থ দপ্তরের সচিব ডা. পি. কে. গোয়েল, আইএএস, তথ্যপ্রযুক্তি অধিকর্তা জেয়া রাগুল গেশন বি, আইএফএস-সহ সরকারি আধিকারিক, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা এবং শিক্ষা ও উদ্ভাবন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং যুব সমাজকে উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানে সক্ষম করে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রগতিশীল নীতি, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ত্রিপুরায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, উদ্ভাবন বৃদ্ধি এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
নতুন সেক্টর-অ্যাগনস্টিক ত্রিপুরা স্টার্টআপ পলিসি চালুর পর রাজ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৮৫টিরও বেশি স্টার্টআপ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১৪০টি রেজিস্ট্রেশন অনুমোদিত হয়েছে এবং ৭০টি স্টার্টআপ স্বীকৃতি পেয়েছে। ‘ট্রাই-সিড ফান্ড’, প্রুফ অব কনসেপ্ট (PoC) সহায়তা এবং পরিচালনাগত সহায়তার মাধ্যমে ইতিমধ্যে ২ কোটি ৭২ লক্ষ টাকারও বেশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা তাঁদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বৃহত্তর ও সম্প্রসারণযোগ্য ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল টি-রাইজ পোর্টালের উদ্বোধন। এটি একটি সমন্বিত সিঙ্গেল-উইন্ডো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা, ইনকিউবেটর, মেন্টর, বিনিয়োগকারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি দপ্তরগুলিকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করবে।
এই পোর্টালের মাধ্যমে প্রযুক্তি, অর্থ, বিপণন, আইন এবং ব্যবসায়িক কৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০ জনেরও বেশি মেন্টর, ১০টিরও বেশি বিনিয়োগকারী, ১০টিরও বেশি কর্পোরেট সংস্থা, ইনকিউবেটর এবং ডোমেন বিশেষজ্ঞের সহায়তা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ত্রিপুরার সঙ্গে যুক্ত দেশ-বিদেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও পেশাদারদেরও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
অনুষ্ঠানে HDFC Bank Limited, Amazon Seller Services Private Limited (Amazon.in) এবং Zoho Corporation Private Limited-এর সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতাপত্র বিনিময় করা হয়। এর ফলে রাজ্যের স্টার্টআপগুলি বিশেষায়িত আর্থিক পরিষেবা, ডিজিটাল ব্যবসায়িক সমাধান, ই-কমার্স ও রপ্তানির সুযোগ, ক্লাউড প্রযুক্তি, মেন্টরশিপ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা পাবে। এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মশালায় টি-হাবের বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে উদ্ভাবন ব্যবস্থাপনা, ব্যবসার সম্প্রসারণ, তহবিল সংগ্রহ এবং বাজার সম্প্রসারণ নিয়ে মেন্টরিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়াও স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট তেজস্বী ভগবতুলা এবং অন্যান্য সফল স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন উদীয়মান উদ্যোক্তারা। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন উদ্যোগ গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পান অংশগ্রহণকারীরা।
স্কাইরুট অ্যারোস্পেস ভারতের প্রথম স্পেস-টেক ইউনিকর্ন। সংস্থাটি ‘বিক্রম-এস’-এর মাধ্যমে ভারতের প্রথম বেসরকারিভাবে উন্নত রকেট উৎক্ষেপণের ইতিহাস তৈরি করেছে। পরবর্তীতে ‘বিক্রম-১’ ভারতীয় মাটি থেকে কক্ষপথে সফলভাবে পৌঁছানো প্রথম বেসরকারিভাবে তৈরি ভারতীয় রকেট হিসেবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করে।
এই সাফল্যের গল্পগুলি ত্রিপুরার তরুণ উদ্যোক্তাদের আরও বড় স্বপ্ন দেখতে এবং আন্তর্জাতিক মানের উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করে।
কর্মশালার মাধ্যমে ত্রিপুরা সরকার ভবিষ্যৎমুখী, উদ্ভাবননির্ভর এবং শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রগতিশীল নীতি সংস্কার, বিশ্বমানের ইনকিউবেশন সহায়তা, শিল্প সংস্থার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে রাজ্যে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ত্রিপুরাকে পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
