সনাতন ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক উৎসব অম্বুবাচী। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে এই উৎসবকে ঘিরে আসামের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দিরে বসে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় ধরিত্রী মা ঋতুমতী হন ও প্রকৃতি নতুন সৃষ্টির শক্তি অর্জন করে।
অম্বুবাচী উপলক্ষে শুধু ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকেই নয়, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী দেশ থেকেও অসংখ্য ভক্ত, সাধুসন্ত ও তন্ত্রসাধক কামাখ্যা ধামে উপস্থিত হন। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় যোগ দেন।
এই কয়েকদিন কামাখ্যা মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ বন্ধ থাকে। বিশ্বাস করা হয়, এই সময় দেবী নিজেই ঋতুমতী অবস্থায় থাকেন। তাই মন্দিরে নিয়মিত দর্শন ও পুজো বন্ধ রাখা হয়। তবে মন্দির চত্বরে চলতে থাকে বিশেষ ধর্মীয় আচার, যজ্ঞ, জপ, তন্ত্রসাধনা ও ভজন-কীর্তন। অম্বুবাচী মেলার অন্যতম আকর্ষণ হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধু-সন্তদের সমাগম। নাগা সাধু, অঘোরী, কাপালিক, তান্ত্রিক ও বিভিন্ন আখড়ার সন্ন্যাসীরা এই সময় কামাখ্যায় আসেন।
তাঁদের অনেকেই সারা বছর নির্জন সাধনায় থাকলেও অম্বুবাচী উপলক্ষে জনসমক্ষে আসেন। ফলে সাধারণ ভক্তদের মধ্যেও এই মেলাকে ঘিরে বিশেষ কৌতূহল দেখা যায়। মেলা প্রাঙ্গণে ধর্মীয় সামগ্রী, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপকরণের অস্থায়ী দোকান বসে। হাজার হাজার ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র বিক্রেতারও এই মেলাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পানীয় জল, অস্থায়ী শৌচাগার ও যাত্রীদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। অম্বুবাচী নিবৃত্তির দিনকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়। মন্দিরের দরজা পুনরায় খোলার পর দেবীর আশীর্বাদস্বরূপ ‘অঙ্গবাস্ত্র’ ও ‘রক্তবস্ত্র’ প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।
ভক্তদের বিশ্বাস, এই প্রসাদ গৃহে রাখলে সুখ, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল লাভ হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি অম্বুবাচী আজ এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। তন্ত্রসাধনা, লোকাচার, কৃষিসংস্কৃতি ও মাতৃশক্তির আরাধনার অনন্য সমন্বয় এই উৎসবকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদা দিয়েছে।
