কৃষি ও উদ্যানপালন ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং কৃষকদের কল্যাণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করলেন ত্রিপুরার কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী রতনলাল নাথ।
তাঁর একাধিক দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY)-র নির্দেশিকায় ‘স্থানীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ’কে অন্তর্ভুক্ত করা, রাজ্যে আরও ৪৫ হাজার সয়েল হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা এবং মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অব হর্টিকালচার (MIDH) প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় কৃষি সম্মেলন – রবি অভিযান ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই দাবিগুলি উত্থাপন করেন।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষি, কৃষক কল্যাণ ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, কেন্দ্রীয় কৃষি প্রতিমন্ত্রী রামনাথ ঠাকুর ও ভগীরথ চৌধুরী, বিভিন্ন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রীরা, কৃষি সচিব অতীশ চন্দ্র, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিক এবং অন্যান্য রাজ্যের প্রতিনিধিরা।
প্রথমে আজ কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শ্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী রতন লাল নাথ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
পরবর্তীতে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী রতন লাল নাথ বলেন, চলতি বছরে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ করেছে এবং রাজ্যের কৃষকদের সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
তিনি জানান, গত রবি মরশুমে রাজ্যে ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান, ৯,৫০০ হেক্টর জমিতে রবি ডালশস্য এবং ৯,৭০০ হেক্টর জমিতে রবি তৈলবীজ চাষ করা হয়েছিল। এসব ফসল গ্রীষ্মকালে ঘরে তোলার কথা।
কৃষিমন্ত্রী জানান, চলতি খরিফ মরশুমে মুখ্যমন্ত্রীর সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় মোট ৩৭,৫০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭,৫০০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান, ২,০০০ হেক্টরে সুগন্ধি ধান, ১৫,০০০ হেক্টরে ডালশস্য, ৮,০০০ হেক্টরে তৈলবীজ এবং ১,০০০ হেক্টরে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, রাজ্যে কৃষক নিবন্ধন (Farmer’s Registry), ডিজিটাল ক্রপ সার্ভে এবং সার বিক্রির জন্য জাতীয় কাঠামো বাস্তবায়নের কাজও চলছে।
কৃষকদের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে রতনলাল নাথ বলেন, ত্রিপুরায় বর্তমানে প্রায় ১৬,৪০০ হেক্টর জমিতে প্রাকৃতিক চাষাবাদ হচ্ছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৩৮ হাজার কৃষক।
তিনি বলেন, গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র প্রাকৃতিক চাষ নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে বায়ো-ফর্মুলেশনও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তাই বায়ো ইনপুট রিসোর্স সেন্টার (BRC)-গুলিকে বিপণন, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি ন্যাচারাল সিড গ্রোয়ার কনসোর্টিয়াম গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, ত্রিপুরায় MOVCD-NER প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজ্যে উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জৈব কৃষিপণ্য নেদারল্যান্ড , অস্ট্রিয়া , জার্মানি, দুবাই ও বাংলাদেশের মতো দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ত্রিপুরায় ৯৬ শতাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উল্লেখ করে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব রাজ্যে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের দাবি জানান।
কৃষি ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে Sub Mission on Agricultural Mechanization (SMAM) এবং Per Drop More Crop (PDMC) প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধিরও দাবি জানান তিনি।
কৃষি মন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টির সময় ধান চাষের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং এতে ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ফসল বিমার সুবিধা পান না। বড় আকারে ধানের ক্ষতি হলে কৃষকদের সুরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার (PMFBY) নির্দেশিকায় ‘স্থানীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান। এর ফলে বন্যা ও জলমগ্নতার মতো স্থানীয় দুর্যোগের কারণে ফসলের ক্ষতিও বিমার আওতায় আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজ্যে আরও ৪৫ হাজার মাটি স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়ার দাবিও জানান কৃষিমন্ত্রী।
এছাড়াও মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অব হর্টিকালচার (MIDH)-এর আওতায় বার্ষিক অ্যাকশন প্ল্যানে এরিয়া এক্সপ্যানশন প্রোগ্রামের জন্য ন্যূনতম বরাদ্দ ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ত্রিপুরায় অ্যাভোকাডো ও রামবুটানের মতো বিদেশি ফলের চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন চারা ও রোপণসামগ্রীর অভাবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রতনলাল নাথ বলেন, মাটির স্তরে দ্রুত এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্টেশন ও স্বীকৃত নার্সারিগুলিকে মানসম্পন্ন রোপণসামগ্রী সরবরাহে উৎসাহিত করা দরকার।
তিনি আরও জানান, রাজ্যে সেন্টার অব এক্সেলেন্সের অনুমোদিত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে MIDH প্রকল্পের পাশাপাশি রাজ্য সরকার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করতে হয় । তাই MIDH-এর অনুদানের হার বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার দাবি জানান তিনি।
একইভাবে, পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট কম্পোনেন্টে বেসরকারি উদ্যোগকে আকৃষ্ট করতে রিজার্ভ ফান্ড থেকে প্রদেয় অংশও ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার দাবি জানান কৃষিমন্ত্রী।
