রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির অতিরিক্ত বোঝা রাজ্য সরকার নিজেই বহন করবে। গ্রাহক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন বিদ্যুৎ মাশুলের ফলে যে অতিরিক্ত অর্থের বোঝা তৈরি হয়েছে, তার ১০০ শতাংশ ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এর ফলে রাজ্যের ১০ লক্ষাধিক বিদ্যুৎ গ্রাহক পরিবার উপকৃত হবেন। আজ সচিবালয়ের প্রেস কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ একথা জানান। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহার নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও স্বস্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে আসছে। বিদ্যুৎ মাশুল নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপের বিষয়টি রাজ্য সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। সেই বিবেচনা থেকেই গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে তা সরকারের পক্ষ থেকে বহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গ্রাহক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই স্পষ্ট। অতীতে বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে হারে গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত বোঝা পড়েছিল, তার তুলনায় বর্তমান সরকার সেই বোঝা গ্রাহকদের উপর না চাপিয়ে নিজেরাই বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১০-১১ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত আট বছরে বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির সামগ্রিক হার ছিল প্রায় ১১৬ শতাংশ। সেখানে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৬-২৭ পর্যন্ত একই সময়ে মোট বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪০.৪২ শতাংশ। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাশুলের বোঝা কমাতে সরাসরি ভর্তুকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ সালের টিইআরসি অনুমোদিত নতুন ট্যারিফ অর্ডারে যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাশুলের বোঝা গ্রাহকদের উপর বহন করতে হচ্ছে, তার সম্পূর্ণ বোঝা রাজ্য সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করবে। এই ভর্তুকি রাজ্যের বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে গৃহস্থালি, ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী, কৃষক, শিল্প সহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তবে রেলওয়ে ট্র্যাকশনের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এছাড়াও ডিফেন্স ইনস্টলেশন, রেলওয়ে, অল ইন্ডিয়া রেডিও, দূরদর্শন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নির্ধারিত ১৫ শতাংশের বিষয়টি বহাল থাকবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে ৭৭কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা ভর্তুকি প্রদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১১৭ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে। অর্থাৎ গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে রাজ্য সরকার উল্লেখযোগ্য আর্থিক দায়ভার গ্রহণ করছে। রাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথমবার বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির সম্পূর্ণ অতিরিক্ত বোঝা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বহন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, নতুন বিদ্যুৎ মাশুলের ফলে যেসব গ্রাহক ইতিমধ্যে বর্ধিত হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন, তাদের প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থও সমন্বয়ের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে এই ভর্তুকি কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। ইতিমধ্যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানকারী গ্রাহকদের পরবর্তী তিন মাসের বিল-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের বিলে ধাপে ধাপে সেই অর্থের অ্যাডজাস্টমেন্ট করা হবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, বিদ্যুতের মাশুল নির্ধারণ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংঙ্গা ত্রিপুরা ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন (টিইআরসি)-এর দায়িত্ব। বিদ্যুৎ আইন, 2/3 এ সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী কমিশন বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ট্যারিফ নির্ধারণ করে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এই মাশুল বৃদ্ধির অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকার গ্রাহকদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ মাশুলের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় ব্যয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়েও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মাশুল কাঠামোর কারণে সাধারণ গ্রাহকদের উপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে তা রাজ্য সরকার উপলব্ধি করেছে। বিশেষ করে স্থায়ী মাশুল বা ফিক্সড চার্জ বৃদ্ধির বিষয়টিও রাজ্য সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহার নেতৃত্বাধীন সরকার মানুষের সমস্যা উপলব্ধি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার আর্থিক দায়ভার গ্রহণের ক্ষেত্রে যে সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে, বিদ্যুৎ মাশুলের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোই সরকারের দায়িত্ব। রাজ্য সরকার সেই দায়িত্ব থেকেই বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির অতিরিক্ত বোঝা ১০০ শতাংশ বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে অতিরিক্ত হারে বিল পরিশোধকারী গ্রাহকরাও তাদের প্রাপ্য সমন্বয়ের সুবিধা পাবেন। আগামী কয়েক মাসের বিলেই এর প্রতিফলন দেখা যাবে। তিনি বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের গ্রাহকবান্ধব ও জনদরদী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।
সাংবাদিক সম্মেলনে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের এম ডি বিশ্বজিৎ বসু, ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের অধিকর্তা (টেকনিক্যাল) সুবীর সেন।
