April 23, 2026
image (29)

সময় পার হয়েছে ঠিক এক বছর, কিন্তু শিলচরের অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্যর কাছে গত বছরের ২২ এপ্রিলের সেই দিনটি আজও বর্তমান। পাহালগামের বৈসরণ উপত্যকায় ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ জঙ্গি হামলার স্মৃতি আজও তাঁর কানে বাজে অতর্কিত চিৎকারে, কখনও বা গভীর নিস্তব্ধতায়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশিষ্ট অধ্যাপক সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর সেই অলৌকিক বেঁচে ফেরা এবং ট্রমার বর্ণনা দিয়েছেন।

গত বছর পাহালগামের সেই হামলায় ২০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। অধ্যাপক ভট্টাচার্য স্মরণ করেন, কীভাবে একটি সাধারণ ছুটি মুহূর্তের মধ্যে সাক্ষাৎ মৃত্যুর বিভীষিকায় পরিণত হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা একটি লাশের ঠিক পাশ থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। এক চুলের জন্য সেদিন আমরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।” তাঁর কাছে এই বেঁচে থাকা কোনো অর্জন নয়, বরং কেবলই ভাগ্যের খেলা।

এক বছর পরেও সেই ঘটনার অভিঘাত কাটেনি তাঁর পরিবারে। অধ্যাপক ভট্টাচার্য জানান, এখন তাঁর ঘুম অনেক পাতলা হয়ে গেছে এবং একাগ্রতা কমেছে। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর নিয়মিত পঠন-পাঠন এবং গবেষণার কাজেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেই দুপুরের স্মৃতি। তাঁর স্ত্রীও আজও সেই আতঙ্কে ভোগেন যে, সেদিন হয়তো তিনি তাঁর স্বামী ও সন্তানকে হারাতে পারতেন। এই হারানোর কাল্পনিক ভয়টিই তাঁদের জীবনে এক চিরস্থায়ী শূন্যতা তৈরি করেছে।

তবে এই নৃশংসতার পাশাপাশি অধ্যাপক ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম মানবিকতা। তিনি জানান, হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দারাই পর্যটকদের রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বারবার দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। স্থানীয়দের সেই লজ্জা ও ভাঙা মন দেখে অধ্যাপক বুঝেছিলেন, এই হিংসা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ কখনোই চাননি।

বিশেষ করে একটি ঘটনার কথা তিনি ভুলতে পারেন না—ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এক ছোট্ট শিশু দীর্ঘক্ষণ তাঁদের সঙ্গে ছিল। চরম বিশৃঙ্খলার মাঝেও তাঁরা সেই শিশুটিকে আগলে রেখেছিলেন এবং পরে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। শিলচরে ফিরে আসার পরও সেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, যা এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মাঝেও ছিল এক চিলতে স্বস্তি।

আজ এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্য এই ধরনের হামলার পেছনের কারণ এবং পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সময় পার হলেও মনের ক্ষত সবসময় শুকোয় না। কিছু মুহূর্ত যেখানে ঘটে সেখানেই থমকে থাকে না, বরং ছায়ার মতো মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া হলেও, শান্তি আজও অধরা তাঁর কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *