আপার আসামে সম্প্রতি বয়ে যাওয়া প্রবল ঝড় এবং অতিবৃষ্টির জেরে বাঁশ বাগানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি আধিকারিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং স্থানীয় পরিবেশ—উভয়ই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে টিনসুকিয়া, ডিব্রুগড়, চরাইদেও এবং শিবসাগর জেলায় ধ্বংসলীলার চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই ঝড়ে প্রায় ৪,৪০০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১৮,০০০ মানুষ সরাসরি বিপর্যয়ের কবলে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই বাঁশ বাগানগুলো ‘সবুজ সোনা’ হিসেবে পরিচিত, যা তাঁদের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। টিনসুকিয়ার বাগজান অঞ্চলের এক কৃষক আক্ষেপের সুরে জানান, “বছরের পর বছর ধরে যত্ন করে বড় করে তোলা বাঁশ বাগান এক রাতের তাণ্ডবে চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।” বাঁশ চাষের এই ব্যাপক ক্ষতি সাধারণ কৃষকদের জীবনযাত্রায় এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি, পরিবেশবিদরা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাঁশ বাগানগুলো শুধু সম্পদ নয়, এগুলো বহু পাখি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এবং পতঙ্গের আবাসস্থল। এই বাগানগুলো ধ্বংসের ফলে সেইসব প্রাণীদের আশ্রয় ও খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া, মাটি ধরে রাখা এবং জীববৈচিত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাঁশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা বিঘ্নিত হওয়ায় মাটির ক্ষয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার কারণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাঁশ বনগুলো এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে। অসমের বাঁশ বাগানগুলোতে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত গাছগুলোর সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে বাঁশের যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা এখন চরম আবহাওয়ার কারণে হুমকির মুখে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, যদি এই ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অব্যাহত থাকে, তবে তা বাস্তুসংস্থানকে খণ্ডিত করবে এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়িয়ে তুলবে।
এই পরিস্থিতিতে পরিবেশকর্মীরা জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাগানগুলোর পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি-বনসৃজন (Agroforestry) পদ্ধতির প্রবর্তন এবং বাঁশ সম্পদের সুরক্ষায় শক্তিশালী সরকারি নীতির প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। বাঁশ চাষি ও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর সুরক্ষায় প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নচেৎ এই সবুজ সম্পদ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
